শরীয়তপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য
প্রাচীন। বাঙ্গালির চিরায়ত সংগ্রামে এই এলাকার মানুষের সংগ্রামী ইতিহাস
রয়েছে। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই জেলা পূর্ব মাদারীপুর নামে খ্যাত ছিল ১৯৭৭ সালে
মাদারীপুর মহকুমার পূর্বাঞ্চলীয় ৬টি থানা পালং জাজিরা নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ
ডামুড্যা ও গোসাইরহাট নিয়ে একটি নতুন মহকুমা ‘শরীয়তপুর’ গঠিত হয় এবং ১৯৮৪
সালে তা জেলায় রূপান্তরিত হয়। সুতরাং ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে
তৎকালীন মাদারীপুর
মহকুমা পূর্বাঞ্চলীয় থানাগুলোতে যে
প্রতিবাদ, সংগ্রাম ও সমাবেশ ঘটে তার বিবরণই ভাষা আন্দোলনে অত্র এলাকার
আঞ্চলিক ইতিহাস। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের যে সূত্রপাতঘটে অত্র এলাকা
শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ পত্রিকার মাধ্যমে তা জানতে পারে এবং তাদের
মনেও ভাষা আন্দোলনের চেতনা সৃষ্টি করে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকাতে পুলিশের
গুলিতে ছাত্র হত্যার খবর শহর পেরিয়ে গ্রাম পর্যন্ত পৌছতে ২/১ দিন সময়
লাগলেও সর্বস্তরের মানুষের মনে তা গভীর ক্ষোভ ও ঘৃণা সৃষ্টি করে।
গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত স্কুল ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা কালো ব্যাজ ধারণ
করে, ক্লাস বর্জন করে মিছিল করে এবং প্রতিবাদ সভায় যোগ দেন। তাঁরা ছাত্র
হত্যার বিচার এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবি জানায়। ২১
ফেব্রুয়ারি ঢাকাতে পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যার খবর পালং পৌছে দুই দিন পর।
২৪ ফেব্রুয়ারি তুলাসার গুরুদাস উচ্চ
বিদ্যালয়, পালং উচ্চ বিদ্যালয় এবং রুদ্রকর নীলমণি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা
কালো ব্যাজ ধারণ করে ও প্রতিবাদ মিছিল করে। এখানকার ছাত্রদের নেতৃত্ব দেন
বুড়িরহাটের মজিবর রহমান (সমাজসেবক মজিবর রহমান চৌধুরী)। স্থানীয় স্কুলের
ছাত্ররা মিছিল করে থানা ঘেরাও এবং ধর্মঘট করেন। কিন্তু পাকিস্তানের
প্রভাবশালী দুর্দান্ত পুলিশ প্রশাসনের বিপরীতে স্কুলগামী ছাত্রদের এসব
প্রতিবাদ ও আন্দোলন
তেমনভাবে বিস্তার লাভ করতে পারেনি। তবে
সচেতন ও শিক্ষিতজনেরা অনেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে ভাষা আন্দোলনে সহায়তা
করেছেন। এ প্রসঙ্গ ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আলী আহম্মদ মিয়ার স্মৃতিচারণ থেকে
জানা যায়, পালং তুলাসার গুরুদাস উচ্চ বিদ্যালয়ে (বর্তমানে সরকারি উচ্চ
বিদ্যালয়) ২৩ মার্চ ছাত্ররা স্কুল শুরু হওয়ার আগেই ক্লাস বর্জন করে স্কুল
মাঠে সমবেত হন। ছাত্র নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে এই প্রথম ঢাকার হত্যাকান্ডের
খবর জানতে পেরে ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে এবং বিক্ষোভ করেন। তাঁরা মিছিলসহ
জেলা বোর্ডের রাস্তা ধরে পালং বাজারে যান। বাজার প্রদক্ষিণ করে সেদিনের
মতো ছাত্ররা বাড়ী
ফিরে যান্ অবশ্য এরপর সারা শরীয়তপুরে ভাষা
আন্দোলনের আলোচনা চলতে থাকে। কয়েকদিন পর এ স্কুলের ছাত্ররা আবার ক্লাস
বর্জন করেন। এ সময় ছাত্র নেতা মজিবুর রহমানকে (বুড়িরহাট) পুলিশ গ্রেফতার
করে । এর প্রতিবাদে হরতাল হয়। এছাড়া স্কুলের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে
মিছিলসহ বাজারে যান। মিছিলকারী থানা ঘেরাও এবং অবস্থান ধর্মঘট করেন।
অবস্থান ধর্মঘট ৪ ঘন্টা স্থায়ী হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত সে যাত্রা মজিবুর
রহমান মুক্তি পাননি।
ডামুড্যা ছিল গোসাইরহাট থানার অর্ন্তগত।
ডামুড্যা মুসলিম হাই স্কুল ও দারুল আমান হাইস্কুলের ছাত্ররা ভাষা আন্দোলনে
উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ঢাকার ছাত্র হত্যার খবর ২৪ ফেব্রুয়ারি ডামুড্যা
পৌছে। নেতৃস্থানীয় ছাত্ররা পরদিন ধর্মঘট ও প্রতিবাদ মিছিল করার প্রস্তুতি
গ্রহণ করেন। ২৪ ফেব্রুয়ারী ডামুড্যা মুসলিম হাই স্কুল ও দারুল আমান হাই
স্কুলের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন, কালো ব্যাজ ধারণ ও প্রতিবাদ মিছিল করেন।
তাঁরা গোসাইরহাট থানা সদরের পট্টি স্টীমার ঘাটে গিয়ে প্রতিবাদ জানান। ঐদিন
বিকেল ৩টার সময় ডামুড্যার স্থানীয় ঈদগাহ ময়দানে এক প্রতিবাদ সভা হয়।
সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় মুসলিম লীগ সেক্রেটারি মহিউদ্দিন খাঁ। সভায় বাংলাকে
রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দান, ঢাকায় মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণ সম্পর্কে
নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা, মন্ত্রিসভার পদত্যাগ ও
শহীদ পরিবারবর্গকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দানের দাবি করা হয়। এখানে ছাত্রদের
নেতৃত্বে ছিলেন ডামুড্যা মুসলিম হাই স্কুলের ছাত্র মহিবুল্লাহ আববাস,
আমিনুল ইসলাম, আবদুল জববার, আজিজুল হক (অধ্যক্ষ সরকারি নড়িয়া কলেজ), নুরুল
ইসলাম (প্রধান শিক্ষক , ডামুড্যা মুসলিম হাইস্কুল) ও আবদুর রাজ্জাক (আওয়ামী
লীগ নেতা)। ছাত্রনেতা আমিনুল ইসলামকে পুলিশ ১২ ঘন্টা আটকে রাখে। মুক্তি
লাভের পর তাঁকে ফুলের মালা পরিয়ে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। তবে স্থানীয়
হামিদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষকরা ভাষা আন্দোলনকে কটাক্ষ করেছেন এবং ভাষা
আন্দোলনকে নাজায়েজ বলে ফতোয়া দিয়েছেন।
অবশ্য দারুল আমান হাই স্কুলের প্রধান
শিক্ষক আবদুল গনি মাস্টার এবং মওলানা হাফেজ জালালউদ্দিন ভাষা আন্দোলনে
ছাত্রদের সহায়তা করেছেন এবং উৎসাহ যুগিয়েছেন। শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া ও
ভেদরগঞ্জ থানার কোন কোন স্কুলের ছাত্ররা ছাত্রহত্যার প্রতিবাদ করেছেন।
পদ্মা নদী পার হয়ে চর আত্রা পর্যন্ত এসব খবর পৌঁছে গেছে। নিচের ক্লাসের
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্ররা পর্যন্ত চলতে ফিরতে ভাষা আন্দোলনের শ্লোগান
তুলেছে : ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’. ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ ও ‘নুরুল
আমিনের কল্লা চাই’ । তখন শরীয়তপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভাষা আন্দোলন তেমন
সংঘবদ্ধ রূপ লাভ করতে না পারলেও
একুশের চেতনা সর্বশ্রেণীর মানুষের মধ্যে
ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয় এবং কালক্রমে এধারার আন্দোলনে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি
পায়। আর এজন্য যাঁরা গোপনে ও প্রকাশ্যে কাজ করেছেন তাঁদের মধ্যে উপেন সেন,
শান্তি সেন, ননীনাগ, রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী, সিরাজ সরদার, চুনী
মুখার্জীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । তাছাড়া একুশের আন্দোলনে মেডিকেল
কলেজের বিশিষ্ট ছাত্রনেতা ডা, গোলাম মাওলা এবং শহীদ মিনার নির্মাণের অন্যতম
উদ্যোক্তা ডা. মোসলেমউদ্দিন খান অত্র জেলায়ই জন্মগ্রহণ করেছেন।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন